বিমানবন্দর-গাজীপুর বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প বাতিল এবং প্রকল্পের অবকাঠামোকে ৩+৩ লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)। পরিকল্পনাবিদদের এই সংগঠন সিদ্ধান্তটি প্রত্যাহারসহ ছয় দফা দাবি তুলেছে।
বিআইপির সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান স্বাক্ষরিত ২০ অক্টোবরের এক বিবৃতিতে বলা হয়, সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে তারা জানতে পেরেছে যে সরকার বিআরটি প্রকল্প বাতিল ও সংশ্লিষ্ট সংস্থা বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
‘গণপরিবহনের ইতিহাসে কালো দিন’
বিবৃতিতে বিআইপি বলেছে, ১৮ অক্টোবরের মন্ত্রিসভা বৈঠকে সরকার বিআরটি নিয়ে ‘সর্বশেষ ও সবচেয়ে খারাপ বিকল্পটিই’ বেছে নিয়েছে। বৈঠকের পর নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়েও সিদ্ধান্তটি জানানো হয়নি বলে সংগঠনটির অভিযোগ। এতে কিছু গোপন করার চেষ্টা নিয়ে জল্পনার সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় তারা ‘সুস্পষ্টভাবে স্বার্থের সংঘাত’ দেখতে পাচ্ছে বলে দাবি করেছে বিআইপি।
সংগঠনটি দিনটিকে টেকসই, জ্বালানিসাশ্রয়ী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণপরিবহনের ইতিহাসে একটি ‘কালো দিন’ আখ্যা দিয়েছে। বিআইপির মতে, এই সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারী এবং দেশ-বিদেশে সক্রিয় নির্মাণ লবির পক্ষে গেছে। এটি গাজীপুর ট্রান্সপোর্ট মাস্টার প্ল্যান (জিটিএমপি) ও ঢাকার সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার (আরএসটিপি) প্রস্তাবনার পরিপন্থী বলেও উল্লেখ করেছে তারা। বিবৃতিতে বলা হয়, ১৪ বছর ধরে নির্মাণকাজের দুর্ভোগ পোহানো গাজীপুর ও উত্তরার বাসিন্দাদের প্রত্যাশা ও চলাচলের চাহিদার প্রতিও এই সিদ্ধান্ত সুবিচার করেনি।
বিআইপির ছয় দাবি
- বিআরটি প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা।
- বিআরটি ও এমআরটির (মেট্রোরেল) পরিচালনা এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের জন্য একটি সমন্বিত সংস্থা গঠন।
- পুরো ঢাকা শহর ও দেশের অন্যান্য মহানগরের জন্য বিআরটির বৃহত্তর পরিকল্পনা প্রণয়ন।
- পরিবহন অবকাঠামোয় প্রকল্পভিত্তিক সিদ্ধান্তের চর্চা বন্ধ করে পরিকল্পনাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ।
- নারী, স্বল্প দূরত্বের যাত্রী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও সীমিত সামর্থ্যের মানুষসহ বেশি মানুষকে কম সময় ও খরচে সেবা দেয়—এমন পরিবহন প্রকল্পকে অগ্রাধিকার।
- বৃহত্তর ঢাকার যেকোনো পরিবহন পরিকল্পনার সিদ্ধান্তে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষকে (ডিটিসিএ) নেতৃত্বদানকারী সংস্থা করা এবং সেটিকে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে নেওয়া।
যা সিদ্ধান্ত হয়েছে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ১৮ অক্টোবরের মন্ত্রিসভা বৈঠকে বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে কয়েকটি বিকল্প পর্যালোচনা করে প্রকল্পটি বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার করিডরের স্টেশন ও আলাদা লেনের বিভাজক সরিয়ে একে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তর করা হবে। প্রকল্পের দুটি দুই লেনের ওভারপাস চার লেনে উন্নীত করা হবে।
বিআরটি পরিচালনার জন্য গঠিত ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট পিএলসি বিলুপ্ত করে এর কাজ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতায় নেওয়া হবে। উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা করে আইনি বিষয়গুলো নিষ্পত্তির পর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পটি বন্ধ করা হবে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ১৯ অক্টোবর সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে চিঠি দিয়ে সিদ্ধান্ত জানিয়েছে এবং ১৫ দিনের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন চেয়েছে।
প্রায় ১৪ বছর ধরে চলা প্রকল্পটিতে এ পর্যন্ত ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা খরচ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।