মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর, ২০২৬

বন্ডে আনা কাপড় খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগ; দুই পোশাক কারখানায় ১০২ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব ফাঁকি শনাক্তের কথা জানাল এনবিআর

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের গোয়েন্দা সেলের তদন্তে রিয়াজ নিটওয়্যার ও লিশা টেক্সের বিরুদ্ধে শুল্কমুক্ত কাপড় সরিয়ে বিক্রি ও রপ্তানিমূল্য কম দেখানোর অভিযোগ উঠেছে; প্রতিষ্ঠান দুটির বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা কাপড় খোলাবাজারে বিক্রি এবং রপ্তানিমূল্য কম দেখানোসহ নানা অনিয়মের মাধ্যমে দুটি পোশাক কারখানা ১০২ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সংস্থাটির সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) আলাদা দুটি তদন্তে এ ফাঁকি শনাক্ত করেছে বলে সোমবার (২ নভেম্বর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিষ্ঠান দুটির নাম রিয়াজ নিটওয়্যার লিমিটেড ও লিশা টেক্স (প্রা.) লিমিটেড বলা হয়েছে। এনবিআরের হিসাবে রিয়াজ নিটওয়্যারের ফাঁকির অঙ্ক ৯৪ কোটি ৭৩ লাখ ৮৭ হাজার ৭২০ টাকা এবং লিশা টেক্সের ৭ কোটি ৮৩ লাখ ২৫ হাজার ৪০৮ টাকা; সব মিলিয়ে ১০২ কোটি ৫৭ লাখ ১৩ হাজার ১২৮ টাকা। এগুলো রাজস্ব কর্তৃপক্ষের তদন্তের ফল; কোনো আদালতে এসব অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।

এনবিআর যা পেয়েছে বলে দাবি করছে

বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সিআইসির দল দুই প্রতিষ্ঠানের কারখানা ও গুদাম সরেজমিনে পরিদর্শন করে কাঁচামালের মজুত যাচাই করেছে এবং আমদানি-রপ্তানির তথ্য নথিপত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছে। রিয়াজ নিটওয়্যার ৪১টি ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশনের (ইউডি) আওতায় বন্ড সুবিধায় ২ হাজার ৮৬২ টন ওভেন পলিয়েস্টার কাপড় আনে। এর প্রায় ২ হাজার ২৩৭ টন, অর্থাৎ ৭৮ শতাংশ, গুদামে পাওয়া যায়নি, রপ্তানির হিসাবেও এর উল্লেখ নেই। যে ৩১টি ইউডির বিপরীতে কোনো রপ্তানি হয়নি, তার ৩০টিতে আমদানি করা পুরো কাপড়ই সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে; আংশিক রপ্তানির ১০টি ইউডিতেও প্রায় ৫৩ শতাংশ কাপড়ের হিসাব মেলেনি।

পরিদর্শনে কারখানায় ৬৯ হাজার ৩৮২ কেজি সুতা, ৮ লাখ ৪৫ হাজার ৩৯৭ পিস তৈরি পোশাক এবং মাত্র ২৫ হাজার ৫৩৩ কেজির কিছু বেশি ওভেন পলিয়েস্টার কাপড় পাওয়া যায়, যা মোট আমদানির ১ শতাংশেরও কম। এনবিআরের হিসাবে সরিয়ে নেওয়া কাপড়ের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ১৩৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা।

লিশা টেক্সের ক্ষেত্রে বন্ডে আনা প্রায় ১ লাখ ৭৪ হাজার কেজি পলিয়েস্টার কাপড় কারখানায় পাওয়া যায়নি; শুধু এ খাতেই প্রায় ৬ কোটি ৯০ লাখ টাকার শুল্ক-কর ফাঁকির কথা বলছে এনবিআর। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অনুমোদনের চেয়ে বেশি পোশাক রপ্তানি করেও চুক্তিমূল্যের চেয়ে কম দাম দেখানো, ইউডির বাইরে স্থানীয় উৎস থেকে কাঁচামাল কেনা এবং বাধ্যতামূলক ২০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত পূরণ না করার অভিযোগও আনা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, অনুমোদন ছাড়া ও মূসক না দিয়ে চার লাখের বেশি পিস পোশাকের আনুষঙ্গিক উপকরণ স্থানীয় বাজার থেকে কেনা হয়েছে এবং লাইসেন্সবিহীন একটি প্রতিষ্ঠানকে ৩ কোটি ২৩ লাখ টাকার কিট ব্যাগ সরবরাহ করে মূসক ফাঁকি দেওয়া হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য মেলেনি

তথ্যগুলো এনবিআরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির, যা রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস ও নয়া দিগন্তসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান দুটির কোনো বক্তব্য আসেনি। ফাঁকি দেওয়া অর্থ আদায়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, বিজ্ঞপ্তিতে তা-ও বলা হয়নি। এনবিআর জানিয়েছে, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ঠেকাতে সিআইসির এ ধরনের অভিযান চলবে।

বন্ড সুবিধার অপব্যবহার নিয়ে অভিযোগ নতুন নয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে টিবিএস জানিয়েছিল, শুল্কমুক্ত কাঁচামাল এনে খোলাবাজারে বিক্রির সন্দেহে প্রায় ১০০ রপ্তানিকারকের গত পাঁচ বছরের ব্যাংক লেনদেন খতিয়ে দেখছে এনবিআর। দেশে প্রায় ৬ হাজার প্রতিষ্ঠানের বন্ড লাইসেন্স রয়েছে। বস্ত্রকল মালিকদের অভিযোগ, বন্ডের অপব্যবহার ও চোরাচালানের মাধ্যমে বছরে প্রায় ৫০০ কোটি ডলারের কাপড়, পোশাক ও আনুষঙ্গিক পণ্য দেশের বাজারে ঢুকছে।