মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে পথকুকুর টিকাদান ও বন্ধ্যাকরণ প্রকল্প
জলাতঙ্ক শতভাগ প্রাণঘাতী হলেও প্রতিরোধযোগ্য; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দিচ্ছে।
জলাতঙ্ক একটি নীরব ঘাতক রোগ, যার উপসর্গ একবার দেখা দিলে প্রায় শতভাগ প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। তবে সময়মতো সতর্কতা ও সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে এই ভয়াবহ রোগ সম্পূর্ণ প্রতিরোধ করা সম্ভব। জলাতঙ্কের দীর্ঘ এবং চিত্রভিত্তিক ইতিহাস ৪ হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। প্রাচীন গ্রিক পুরাণে লিসা নামের এক দেবী উন্মাদনা, ক্ষিপ্ততা ও হিংস্র আচরণের প্রতীক ছিলেন, যা থেকে আধুনিক বিজ্ঞানে জলাতঙ্ক সৃষ্টিকারী ভাইরাসের নাম লিসাভাইরাস রাখা হয়েছে। এমনকি খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে অ্যারিস্টটলের লেখায় উন্মত্ত কুকুরের কামড়ের বিপদ সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ পাওয়া যায়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক বড় পরিবর্তন আসে ১৮৮৫ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর ও তার সহকর্মীদের তৈরি জলাতঙ্কের টিকার মাধ্যমে। এই মহান বিজ্ঞানীর প্রয়াণ দিবস ২৮ সেপ্টেম্বরকে বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস হিসেবে পালন করা হয়, যা ২০০৭ সাল থেকে শুরু হয়েছে। ২০২৬ সালের বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘স্ট্রঙ্গার টুগেদার’ বা ‘একসঙ্গে আরও শক্তিশালী’। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) উল্লেখ করেছে যে, জলাতঙ্ক নির্মূল করা সম্ভব, তবে এর জন্য মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্যকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, মানুষের মধ্যে জলাতঙ্ক সংক্রমণের প্রধান উৎস কুকুর, যা মোট সংক্রমণের প্রায় ৯৯ শতাংশ। বিশ্বে প্রতি বছর আনুমানিক ৫৯ হাজার মানুষ জলাতঙ্কে প্রাণ হারান, যার ৯৫ শতাংশের বেশি মৃত্যু ঘটে এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোতে। শিশুরা এই রোগে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। জলাতঙ্ক প্রতিরোধের জন্য সন্দেহভাজন প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের পর দ্রুত ১৫ মিনিট ধরে সাবান ও পানি দিয়ে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করা এবং প্রয়োজনীয় পোস্ট-এক্সপোজার চিকিৎসা, যেমন টিকা ও র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবুলিন নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হু জানিয়েছে, এই পদক্ষেপগুলো রোগের সূত্রপাত ঠেকাতে পারে।
মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, কুকুর ও বিড়ালের আক্রমণের পর চিকিৎসাসেবা গ্রহণকারীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। ২০২৩ সালে ৯৪ হাজার ৩৮০ জন, ২০২৪ সালে ১ লাখ ২২ হাজার ২৬৩ জন এবং ২০২৫ সালে ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৪৩ জন চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন। একই সময়ে জলাতঙ্কে মৃত্যুর সংখ্যাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২০২৩ সালে ৪২ জন, ২০২৪ সালে ৫৮ জন এবং ২০২৫ সালে ৫৯ জন জলাতঙ্কে মারা যান। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ৫৯ জন জলাতঙ্ক রোগীর মৃত্যুর তথ্য দেওয়া হয়েছে।
এই ভয়াবহ রোগ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সরকার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মাধ্যমে ‘পথ কুকুরের মাধ্যমে জলাতঙ্ক রোগ বিস্তার রোধ’ শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সাল থেকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত। ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকা এই প্রকল্পের আওতাভুক্ত। প্রকল্পের পরিকল্পনায় প্রতি বছর ৬৫ হাজার পথকুকুরকে টিকাদান এবং প্রকল্প মেয়াদে ৬৫ হাজার পথকুকুরকে বন্ধ্যাকরণের মাধ্যমে সংখ্যা ব্যবস্থাপনার কথা রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কুকুরের গণটিকাদানকে জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর কৌশলগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক জোট (জিএআরসি), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বিশ্ব প্রাণী স্বাস্থ্য সংস্থা ‘জিরো বাই থারটি’ লক্ষ্য সামনে নিয়েছে। এই লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে কুকুরের মাধ্যমে ছড়ানো জলাতঙ্ক রোগে মানুষের মৃত্যু শূন্যে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর জন্য ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজের সম্মিলিত সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। শিশুদের প্রাণীর প্রতি সতর্ক থাকতে শেখানো এবং পোষা প্রাণীর নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এই লক্ষ্যে ‘ওয়ান হেলথ’ ধারণা অর্থাৎ মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণীর স্বাস্থ্য এবং পরিবেশকে সমন্বিতভাবে দেখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে, যা স্থানীয় পর্যায়ে শক্তিশালী সমন্বয় নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।