কাগজে শেয়ারের মালিক একজন, কিন্তু কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ আরেকজনের হাতে—এমন গোপন মালিকানা ঠেকাতে কোম্পানি আইনে নতুন ধারা যুক্ত করতে যাচ্ছে সরকার। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইনের ৪০টি ধারায় পরিবর্তন এনে ৩৫ বছর পর বড় আকারের সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আইন প্রণয়নের পর এ পর্যন্ত দুবার ছোট সংশোধন হয়েছে; বড় ধরনের সংশোধন এবারই। সংশোধনীর প্রাথমিক খসড়ায় কোম্পানির প্রকৃত মালিকানা প্রকাশ, ডিজিটাল ব্যবস্থায় নিবন্ধন ও নথি সংরক্ষণ এবং ব্যবসা পরিচালনার প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। খসড়াটি এখন চূড়ান্ত হওয়ার পর্যায়ে রয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক হওয়ার কথা আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে। এরপর খসড়া মন্ত্রিসভায় পাঠানো হবে।
বর্তমান আইনে কোম্পানির প্রকৃত মালিক কে, তা শনাক্ত করার ব্যবস্থা না থাকায় গোপন মালিকানার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর একটি উদাহরণ হিসেবে উঠে আসছে আন্তর্জাতিক গেটওয়ে কোম্পানি ইন্টারন্যাশনাল ভয়েস কে টেল লিমিটেডের ঘটনা। প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১২৬ কোটি টাকার টেলিযোগাযোগ বিল বকেয়া ছিল। মালিকানা হস্তান্তর দেখানো হয় এমন তিন ব্যক্তির নামে, যাঁরা বাস্তবে বিষয়টি জানতেন না; তাঁদের একজন সাখাওয়াত হোসেন। ২০২৫ সালের ১৮ মার্চ হাইকোর্ট বিটিআরসি ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত করে প্রকৃত মালিককে খুঁজে বের করতে বলেন। পরবর্তী তদন্তে উঠে আসে, ঘটনার নেপথ্যে ছিলেন আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা।
ব্যাংক খাতেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সরাসরি এবং অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শেয়ার ধারণ করেছিলেন। ইসলামী ব্যাংকে তাঁদের সম্মিলিত শেয়ার ছিল প্রায় ৩০ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে প্রায় ২২ শতাংশ। ব্যাংকগুলোর পর্ষদে গ্রুপটির চেয়ারম্যানের জামাতা বেলাল আহমেদসহ পরিবারের একাধিক সদস্য ছিলেন। অভিযোগ আছে, বেশির ভাগ শেয়ার নামে-বেনামে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর ব্যাংকগুলো থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ বের করে নেওয়া হয়, যা এখনো উদ্ধার করা যায়নি।
দেশের বাইরেও বেনামি শেয়ারের মালিকানা নিয়ে আলোচিত মামলার নজির আছে। যুক্তরাজ্যের আদালতে অ্যান্ড্রু রুহান ও অ্যান্থনি স্টিভেন্স মামলা নামে পরিচিত ঘটনাটি ২০০৪-২০০৫ সালের। ব্যবসায়ী অ্যান্ড্রু রুহান কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লন্ডনের তিনটি হোটেল কেনেন, যেগুলো সবাই অ্যান্থনি স্টিভেন্সের মালিকানাধীন বলে জানতেন। পরে আদালতে প্রমাণিত হয়, হোটেলগুলোর প্রকৃত মালিক রুহান; আদালত তাঁকে গোপনে অর্জিত মুনাফার হিসাব দিতে নির্দেশ দেন। আন্তর্জাতিকভাবে এ ধরনের ঘটনাকে বেনামি বা মনোনীত শেয়ারধারীর আড়ালে প্রকৃত মালিকানা বলা হয়। সরকার এমন ঘটনা দেশে আর ঘটতে দিতে চায় না; সেই লক্ষ্যেই আইনে নতুন ধারা যুক্ত হচ্ছে।