শিল্পায়নে পুঁজিবাজারের ভূমিকা কম: দীর্ঘসূত্রতা ও নীতির দুর্বলতা চিহ্নিত
দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের কাঠামো ব্যাংকনির্ভর হওয়ায় গত আড়াই বছরে নতুন কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়নি।
পুঁজিবাজারকে দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম প্রধান আর্থিক খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে দেশের অর্থনীতির আকার যতটা বেড়েছে, পুঁজিবাজারের গভীরতা, প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ ও বিদেশি বিনিয়োগপ্রবাহ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়েনি। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের কাঠামো এখনো ব্যাংকনির্ভর হয়ে আছে, যা আর্থিক ব্যবস্থায় এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে।
গত প্রায় আড়াই বছরে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে নতুন কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হতে পারেনি। ব্যাংক ঋণ সহজলভ্য হওয়ায় এবং পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির দীর্ঘসূত্রতার কারণে শিল্পোদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদি অর্থের জন্য ব্যাংকে ছুটছেন। এ কারণে দেশের শিল্পায়নে পুঁজিবাজার খুব একটা ভূমিকা রাখতে পারছে না। শিল্প খাতে মোট অর্থায়নের সামান্য অংশ মাত্র পুঁজিবাজার থেকে আসায় দেশের পুরো অর্থনৈতিক ঝুঁকি গিয়ে পড়ছে ব্যাংক খাতের ওপর।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিল্পায়নে ব্যাংক খাত থেকে অর্থায়ন হয়েছে ৯৭ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা, যেখানে পুঁজিবাজার থেকে এসেছে মাত্র ৩০২ কোটি টাকা, যা মোট অর্থায়নের ০.৩১ শতাংশ। পূর্ববর্তী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ব্যাংকিং মাধ্যমে অর্থায়ন ছিল ৮৮ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা এবং পুঁজিবাজার থেকে এসেছে ৬৭৯ কোটি টাকা বা ০.৭৬ শতাংশ। একইভাবে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে ৯৫ হাজার ১৭২ কোটি টাকা এবং পুঁজিবাজার থেকে ৬৪১ কোটি টাকা (০.৬৭ শতাংশ) এসেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ব্যাংক খাতের মাধ্যমে ৭২ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা এবং পুঁজিবাজারের মাধ্যমে ৬৮৫ কোটি টাকা (০.৯৪ শতাংশ) পুঁজির সংস্থান হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য নীতিমালায় কাঠামোগত পরিবর্তন এনে বড় প্রকল্পে ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের অর্থায়নে একটি যৌক্তিক অনুপাত নির্ধারণের এবং পুঁজিবাজার থেকে পুঁজি উত্তোলন বাধ্যতামূলক করার জোর তাগিদ দিয়েছেন। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের (বিএপিএলসি) সভাপতি এবং ন্যাশনাল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ বলেন, “গত প্রায় আড়াই বছরে বাজারে নতুন কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হতে পারেনি। দীর্ঘসূত্রতার কারণেই মূলত উদ্যোক্তারা পুঁজিবাজারে আসতে আগ্রহী হন না। আমাদের দেশে একটি আইপিও অনুমোদন হয়ে বাজারে আসতে সর্বনিম্ন ১৫ মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়। অথচ ব্যাংকে আবেদন করলে মাত্র তিন সপ্তাহেই ঋণ পাওয়া সম্ভব, ক্ষেত্রবিশেষে সর্বোচ্চ তিন মাস সময় লাগে।” তিনি আরও জানান, শেয়ারবাজারের নতুন কমিশন এখন তিন থেকে চার মাসের মধ্যেই আইপিও প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে এবং আইপিওর অর্থ দিয়ে ব্যাংক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশের বাধ্যবাধকতা শিথিল করা হচ্ছে। এছাড়াও, সরাসরি তালিকাভুক্তির (ডাইরেক্ট লিস্টিং) সুযোগও পুনরায় চালুর চিন্তাভাবনা চলছে।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সাধারণ সম্পাদক এবং এমটিবি ক্যাপিটাল লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সুমিত পোদ্দার অর্থায়নের ক্ষেত্রে নীতিমালায় পরিবর্তন এনে ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের মধ্যে একটি যৌক্তিক অনুপাত নির্ধারণের কথা বলেছেন। তিনি বলেন, “বর্তমানে কত টাকার বেশি অর্থায়ন করতে হলে ব্যাংকের বাইরে পুঁজিবাজারে আসতে হবে—সে সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বাংলাদেশে যত সহজে ব্যাংক ঋণ পাওয়া যায়, সেটি বিশ্বের আর কোথাও নেই।” তিনি প্রস্তাব করেন যে, মোট অর্থায়নের ৬০ শতাংশ ব্যাংক এবং ৪০ শতাংশ পুঁজিবাজার থেকে নেওয়ার নিয়ম করা যেতে পারে। সুমিত পোদ্দার আরও উল্লেখ করেন, বর্তমান তারল্য সংকটের কারণে কেবল ব্যাংকের পক্ষে উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়, ফলে বড় প্রকল্প কিংবা বিনিয়োগের জন্য পুঁজিবাজারে আসা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
বিশ্বজুড়ে উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে অবকাঠামো ও শিল্প খাতের অর্থায়নে প্রধান ভূমিকা রাখে পুঁজিবাজার, যেখানে করপোরেট বন্ড, সুকুক ও গ্রিন বন্ডের মাধ্যমে মেগা প্রকল্পগুলোর মূলধন সংগৃহীত হয়। ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উন্নত দেশগুলোতে জিডিপির তুলনায় পুঁজিবাজারের মূলধনের অনুপাত ৮০ থেকে ১২০ শতাংশ পর্যন্ত, অথচ বাংলাদেশে এই অনুপাত ১০ শতাংশেরও নিচে। দীর্ঘমেয়াদি মেগা ঋণের পুরো বোঝা ব্যাংক খাতের ওপর চাপানোর ফলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকট জটিল রূপ ধারণ করছে।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার অতিমাত্রায় ইকুইটি-নির্ভর এবং নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বন্ড মার্কেট বা মিউচুয়াল ফান্ড খাত শক্তিশালী হতে পারেনি। বাজারে ভালো ও মৌলিকভাবে শক্তিশালী শেয়ারের চরম ঘাটতি রয়েছে। বিগত বছরগুলোতে যেসব আইপিও এসেছে, তার অনেকগুলোই মানহীন হওয়ায় কিছুদিন পর লোকসানি বা ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে পরিণত হয়েছে। ভালো বহুজাতিক ও দেশি বড় কোম্পানিকে বাজারে আনতে কার্যকর নীতিগত কর-প্রণোদনা না থাকায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে ভরসা পাচ্ছেন না।
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক আবুল কালাম জানিয়েছেন, পুঁজিবাজারের উন্নয়নে ইতোমধ্যে পাবলিক ইস্যু রুল সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য খাতের বিদ্যমান সমস্যাগুলোও দূর করার কাজ চলছে। এ ছাড়া কোম্পানির সরাসরি তালিকাভুক্তির বিষয়টিও কমিশনের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। বন্ড বাজারকে আরো শক্তিশালী করার পাশাপাশি করপোরেট বন্ডের প্রবাহ বাড়াতে কমিশন বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।