বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬

সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ বেড়ে ১১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, এক বছরে বৃদ্ধি ১ লাখ ৬৭ হাজার কোটি; ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে

চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই ব্যাংক খাত থেকে বছরের লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ২৫ শতাংশ ঋণ নিয়েছে সরকার; রাজস্ব আদায়েও ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

সরকারের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। গত ১ অক্টোবর শেষে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের পুঞ্জীভূত ঋণ দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৯৫ হাজার ১২৮ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে এ ঋণ ছিল ১০ লাখ ২৭ হাজার ২৩২ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে অভ্যন্তরীণ ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৮৯৭ কোটি টাকা। এই ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশই নেওয়া হয়েছে ব্যাংক খাত থেকে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ব্যাংক খাত সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে। চলতি অর্থবছরে সরকার ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছে। জুলাই থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত নিট ২৭ হাজার ৭১০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে, অর্থাৎ প্রথম তিন মাসেই লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ২৫ শতাংশ। বর্তমানে ব্যাংক খাতে সরকারের ঋণ স্থিতি ৭ লাখ ১৩ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ ৬ লাখ ১৪ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৯৮ হাজার ৬১৯ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেকটি প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতে সরকারের ঋণ স্থিতি ৪ লাখ ৮১ হাজার ৯৪১ কোটি টাকা, যার মধ্যে সঞ্চয়পত্র খাতে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা।

প্রতি বছর সরকার বড় অঙ্কের ঘাটতি রেখে বাজেট দেয়। এই ঘাটতি মেটানো হয় মূলত অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক—দুই উৎস থেকে। বৈদেশিক উৎস থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ না মিললে অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে রয়েছে ব্যাংকব্যবস্থা, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা কোম্পানি ও সঞ্চয়পত্র। সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজেটে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক হলেও সেই অনুপাতে রাজস্ব আয় হচ্ছে না, ফলে প্রতি বছরই ঘাটতি বাজেট দিতে হচ্ছে।

ঋণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুদের বোঝাও বাড়ছে। সুদ পরিশোধ এখন সরকারের বড় ব্যয়ের খাত। চলতি অর্থবছরে দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট বাজেটের ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। গত অর্থবছরের মূল বাজেটে সুদ ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা, পরে সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা করা হয়। পুরোনো ঋণের সুদ পরিশোধ করতেও এখন নতুন ঋণ নিতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। কিন্তু প্রথম দুই মাসেই রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। জুলাই ও আগস্টে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮১ হাজার ৫৩ কোটি টাকা, আদায় হয়েছে ৫৫ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা—ঘাটতি ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। এ সময়ে লক্ষ্যমাত্রার ৬৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ আদায় করতে পেরেছে এনবিআর।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বিভিন্ন কারণে সরকারের ব্যয়ের বোঝা ক্রমেই বাড়ছে, অথচ অদূর ভবিষ্যতে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার সম্ভাবনা নেই; আগের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ধরে রাখাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতি থেকে বের হতে সরকারি অর্থের অপচয় রোধ, ব্যয়ে সাশ্রয়ী হওয়া এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো জরুরি। তাহলে ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।