বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬

ইসরায়েলের (অধিকৃত ফিলিস্তিন) নির্বাচন: নেতানিয়াহুর জোট ৫৩, বিরোধী জোট ৪৮, আরব দলগুলো ১৯ আসন

নিয়মিত ব্যালটের শতভাগ গণনা শেষে কোনো জোটই ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি, সরকার গঠনের চাবিকাঠি এখন রেকর্ড ১৯ আসন পাওয়া আরব দলগুলোর হাতে।

ইসরায়েলের (অধিকৃত ফিলিস্তিন) ২৬তম নেসেট নির্বাচনে নিয়মিত ব্যালটের শতভাগ গণনা শেষ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ডানপন্থী ও ধর্মীয় দলগুলোর জোট পেয়েছে ৫৩ আসন, সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ৪৮ আসন, আর আরব দলগুলো পেয়েছে রেকর্ড ১৯ আসন। ১২০ আসনের নেসেটে সরকার গঠনে দরকার ৬১ আসন। কোনো জোটই সেই সংখ্যা ছুঁতে না পারায় সরকার কে গড়বে, তা এখনো অনিশ্চিত।

মঙ্গলবারের (২৭ অক্টোবর) ভোটের পর কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি বুধবার (২৮ অক্টোবর) নিয়মিত ভোটকেন্দ্রের ব্যালট গণনা শেষ করে এই ফল জানায়। তবে সৈনিক, পুলিশ, কূটনীতিক, হাসপাতালের রোগী ও বিশেষ কেন্দ্রের ভোটারদের ‘ডাবল এনভেলপ’ ব্যালট এখনো গণনা হয়নি। এই ব্যালটের সংখ্যা পাঁচ লাখের কাছাকাছি, যা দু-একটি আসন এদিক-ওদিক করে দিতে পারে।

কোন দল কত আসন

নেতানিয়াহুর লিকুদ ২৬ আসন নিয়ে নেসেটের বৃহত্তম দল হচ্ছে। তাঁর জোটে আরও আছে ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম, শাস ও ইতামার বেন-গভিরের ওৎজমা ইয়েহুদিত, প্রতিটি ৭ আসন করে, এবং বেজালেল স্মোত্রিচ ও মোশে ফাইগলিনের রিলিজিয়াস জায়োনিজম-জেহুত জোট ৬ আসন। সব মিলিয়ে ৫৩ আসন, সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে ৮ আসন দূরে।

বিরোধী শিবিরে আইজেনকটের নতুন দল ইয়াশার পেয়েছে ২১ আসন। নাফতালি বেনেট ও ইয়াইর লাপিদের বেইয়াখাদ ১২, ইয়াইর গোলানের ডেমোক্র্যাটস ৮ এবং আভিগদর লিবারম্যানের ইয়িসরায়েল বেইতেনু ৭ আসন পেয়েছে। এই চার দলের মোট আসন ৪৮।

আরব দলগুলোর মধ্যে জয়েন্ট লিস্ট ১২ ও মনসুর আব্বাসের রা’আম ৭ আসন পেয়েছে। আরব দলগুলোর সম্মিলিত ১৯ আসন নেসেটের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০২০ সালে তারা সর্বোচ্চ ১৫ আসন পেয়েছিল।

ইয়োয়াজ হেন্দেল ও ইয়ারন জেলেখার রিজার্ভিস্টস অ্যান্ড ইকোনমিক পার্টি ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং ওফের উইন্টারের আমখা ইয়িসরায়েল ১ দশমিক ৬১ শতাংশ ভোট পেয়ে ৩ দশমিক ২৫ শতাংশের ন্যূনতম সীমা পার হতে পারেনি। তাদের ভোট কোনো আসনে পরিণত হয়নি।

রেকর্ড ভোটার উপস্থিতি

এবারের নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ১৯৯৯ সালের পর সর্বোচ্চ। ২০২২ সালের নির্বাচনের তুলনায় উপস্থিতি বেড়েছে ৭ দশমিক ১ শতাংশীয় পয়েন্ট। আরব নাগরিকদের মধ্যে ভোট পড়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ, যা আরব দলগুলোর আসন বাড়ার প্রধান কারণ। সেনাসদস্যদের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৭৯ দশমিক ৯ শতাংশ, আগের নির্বাচনের চেয়ে ৬ দশমিক ২ পয়েন্ট বেশি।

কে কী বলছেন

ফল আসার পর আইজেনকট বলেন, ভোটাররা পরিবর্তন বেছে নিয়েছে, নেতানিয়াহুর এখন সরে দাঁড়ানো উচিত। ‘আমরা ইতিহাস গড়েছি,’ বলেন তিনি। নেতানিয়াহুর অধীনে, এমনকি পালাক্রমে প্রধানমন্ত্রিত্বের শর্তেও তিনি কোনো সরকারে যাবেন না বলে আগেই জানিয়ে দিয়েছেন।

নেতানিয়াহু ‘জায়োনিস্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ’ দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান এবং বিদায়ী জোটের ‘অনুগত অংশীদারদের’ ধন্যবাদ দেন। আরব দলগুলোর ওপর নির্ভর করে সরকার গঠনের বিরুদ্ধে তিনি সতর্ক করেন।

গণনা চলার মধ্যেই ডেমোক্র্যাটস নেতা ইয়াইর গোলান বলেন, ‘নেতানিয়াহু হেরে গেছেন। আমি ১২০ পর্যন্ত গুনতে জানি। ৬৫, ৫৫-এর চেয়ে বেশি।’ বিরোধী জোট ও আরব দলগুলোকে এক করে তিনি পরিবর্তনের সরকার গড়ার আহ্বান জানান। ইহুদি ও আরব ভোটের মধ্যে নেতানিয়াহুর বিভাজনকে তিনি ‘বর্ণবাদী’ বলে আখ্যা দেন। বর্তমান হিসাবে বিরোধী জোট ও আরব দলগুলোর সম্মিলিত আসন ৬৭।

জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসুফ জাবারিন বলেন, নেতানিয়াহু, বেন-গভির ও স্মোত্রিচের সরকারকে সরানোর পথ তৈরি করতে তাঁর দল প্রস্তুত। যারা বিকল্প সরকার চায়, তাদের ‘আমাদের সঙ্গে কথা বলতেই হবে।’ একই দলের আহমদ তিবি বলেন, ‘সাহস থাকলে বিরোধী জোট সরকার গঠন করতে পারবে।’

রা’আম নেতা মনসুর আব্বাস জানান, আইজেনকটের নেতৃত্বে টেকসই জোট হলে তাঁর দল সরাসরি তাতে যোগ দেবে। ‘সবাই আমাদের সঙ্গে কথা বলছে, শুধু পরিবর্তনের শিবির নয়,’ বলে তিনি জানান, লিকুদও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। জোটে যাওয়ার আগে রা’আম জননিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ে একটি মন্ত্রী বা উপমন্ত্রীর পদ চাইতে পারে। আরব জনপদে সংঘবদ্ধ অপরাধ, আবাসন সংকট ও বৈষম্য নিয়ে প্রতিশ্রুতিও দুই দলের দাবির তালিকায় থাকবে।

আরব দলই কিংমেকার, কিন্তু...

বিরোধী জোটের ৪৮ আসনের সঙ্গে আরব দলগুলোর ১৯ যোগ হলে ৬৭ আসন হয়, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু সমস্যা হলো, বেনেট ও লিবারম্যান দুজনেই নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাঁরা আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকারে বসবেন না। ২০২১ সালে বেনেটের সরকারে রা’আম ছিল, এবং ডানপন্থী সদস্যদের দলত্যাগে সেই জোট এক বছরের মাথায় ভেঙে যায়। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার তাঁরা দূরত্ব রাখছেন।

আইজেনকট নিজেও বলেছেন, তিনি ‘জায়োনিস্ট সরকার’ গঠনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। অর্থাৎ আরব দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল সরকার তাঁর প্রথম পছন্দ নয়। বিরোধী জোটের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী কে হবেন, সে প্রশ্নে তিনি বলেছেন, জোটের বৃহত্তম দলের নেতাই প্রার্থী হওয়া উচিত। এ নিয়ে এখনো কোনো সমঝোতা ঘোষিত হয়নি।

সামনে এখন কয়েকটি সম্ভাবনা। প্রথমত, রা’আমকে জোটে নিয়ে এবং জয়েন্ট লিস্টের বাইরে থেকে সমর্থনে আইজেনকটের সংখ্যালঘু সরকার; নব্বইয়ের দশকে ইৎজাক রাবিন ও শিমন পেরেসের সরকার এভাবেই আরব দলের বাইরের সমর্থনে টিকেছিল। দ্বিতীয়ত, নেতানিয়াহুর সঙ্গে জাতীয় ঐক্যের সরকার, যদিও আইজেনকট তা নাকচ করেছেন এবং ২০২০ সালে বেনি গান্টজের সঙ্গে পালাক্রমের চুক্তি ভেঙে যাওয়ার নজির সবার মনে আছে। তৃতীয়ত, কোনো সরকার গঠিত না হলে আরেক দফা নির্বাচন, যেখানে এবারের উচ্চ ভোটার উপস্থিতি আর নাও থাকতে পারে।

এর মধ্যে বিরোধী দুই শিবির আরব দলগুলোর সমর্থনে লিকুদের আমির ওহানাকে নেসেটের স্পিকার পদ থেকে সরানোর পরিকল্পনা করছে। তা হলে নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী থাকলেও ৭ অক্টোবরের হামলা নিয়ে রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনের মতো আইন পাস করানো সম্ভব হবে।

ওয়াশিংটনের চাপ, শেকেলের পতন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, নেতানিয়াহুর পরবর্তী সরকারে তিনি বেন-গভিরকে দেখতে চান না; স্মোত্রিচের বিষয়েও তাঁর আপত্তি থাকার সম্ভাবনা আছে। তবে এ নিয়ে কোনো সমঝোতা হয়নি। অনিশ্চিত ফল আসার সঙ্গে সঙ্গে ইসরায়েলের (অধিকৃত ফিলিস্তিন) মুদ্রা শেকেলের দর পড়ে যায়।

চূড়ান্ত ফল কবে

ডাবল এনভেলপ ব্যালট গণনা বুধবার মধ্যরাতে শুরু হয়ে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা নাগাদ শেষ হওয়ার কথা। এরপরও আগামী সপ্তাহে যাচাই-বাছাই চলবে, ফলে তখনকার ফলও হবে ‘প্রায় চূড়ান্ত’, সনদপ্রাপ্ত নয়। নির্বাচন কমিটির কর্মকর্তারা বলছেন, এই ব্যালট আসন বণ্টনে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনই বলা কঠিন। চূড়ান্ত ফলের পর নিয়ম অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করে একজনকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন। ততদিন ইসরায়েল (অধিকৃত ফিলিস্তিন) তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই চলবে।