সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬

সাপের কামড়ের প্রতিষেধক তৈরির গবেষণা থমকে: রাসেলস ভাইপারের অ্যান্টিবডি উৎপাদনের পর অর্থ বরাদ্দ নেই

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের ভেনম রিসার্চ সেন্টার দুই বছর আগে প্রতিবেদন জমা দিলেও তহবিলের অভাবে কার্যক্রম প্রায় বন্ধ; এখনো ভারত থেকে আনা প্রতিষেধকই ভরসা।

সাপের কামড়ে বছরে হাজারো মানুষের মৃত্যুর দেশে নিজস্ব প্রতিষেধক (অ্যান্টিভেনম) তৈরির গবেষণা অর্থ সংকটে থমকে আছে। রাসেলস ভাইপারের প্রতিষেধক তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, অর্থাৎ অ্যান্টিবডি উৎপাদনের কাজ শেষ করে দুই বছর আগে সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে বাংলাদেশের ভেনম রিসার্চ সেন্টার। কিন্তু কোনো অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির সব গবেষণা কার্যক্রম এখন প্রায় বন্ধ।

২০১৮ সালে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ ক্যাম্পাসে প্রতিষ্ঠিত এই সেন্টার দেশে এ ধরনের একমাত্র প্রতিষ্ঠান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৭ সালে সাপের কামড়কে ‘চরম উপেক্ষিত’ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে তালিকাভুক্ত করে এবং প্রতিটি সদস্য দেশকে নিজ অঞ্চলের সাপের বিষ ব্যবহার করে প্রতিষেধক তৈরির আহ্বান জানায়। সেই প্রেক্ষাপটেই সেন্টারটি গড়ে ওঠে। প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল সাপের নমুনা ও বিষ সংগ্রহ; দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য প্রতিষেধক তৈরি।

সেন্টারের মুখ্য গবেষক ও চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক অনিরুদ্ধ ঘোষ জানান, ২০২৪ সালের ৩০ জুনের পর থেকে সরকার আর কোনো অর্থ অনুমোদন দেয়নি। তহবিলের অভাবে গবেষণা কার্যক্রম প্রায় থমকে গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক মো. হালিমুর রশীদ বলেন, অপারেশনাল প্ল্যানের অধীন থাকা প্রকল্পগুলোকে রাজস্ব খাত ও ডিপিপির আওতায় নেওয়ার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। তবে বিষ রিসার্চ সেন্টারের অর্থায়ন আপাতত বন্ধ থাকবে, কারণ এটি কোন খাত থেকে অর্থায়ন হবে, সেই সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।

২০২৩ সালের সরকারি তথ্যের বরাতে বলা হয়, দেশে প্রতি বছর সাড়ে চার লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন এবং সাড়ে সাত হাজারের বেশি মানুষ মারা যান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে বিশ্বজুড়ে বছরে আনুমানিক ৫৪ লাখ মানুষ সাপের কামড় খান, যাঁদের মধ্যে ১৮ থেকে ২৭ লাখের শরীরে বিষ প্রবেশ করে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালিত জাতীয় সর্পদংশন জরিপে দেখা গেছে, দেশে সাপের কামড়ের এক-চতুর্থাংশ ঘটনায় বিষধর সাপ জড়িত এবং কামড়ের ৯৫ শতাংশ ঘটনা গ্রামীণ এলাকায় ঘটে। প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ কামড়ের স্থানে গিঁট দেন; চিকিৎসকের বদলে ওঝা বা ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভরতার কারণে প্রতি বছর ছয় হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। জরিপ অনুযায়ী সাপে কাটা রোগীদের ৮৬ শতাংশ অপচিকিৎসার শিকার হন, আর মাত্র তিন শতাংশ হাসপাতালে যান।

গবেষকরা বলছেন, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে দক্ষিণ ভারত থেকে আনা প্রতিষেধক দিয়ে রোগীদের চিকিৎসা করা হয়। ওই প্রতিষেধক ভারতীয় প্রজাতির সাপের বিরুদ্ধে তৈরি, তাই দেশের স্থানীয় সাপের বিষ নিষ্ক্রিয় করতে তা বৈজ্ঞানিকভাবে পুরোপুরি কার্যকর নয়। প্রতিষেধক তৈরির প্রক্রিয়ায় বিষধর প্রাণীর বিষের কিছু অংশ অন্য একটি প্রাণীর শরীরে প্রয়োগ করা হয়; এতে সেই প্রাণীর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, যা পরিশুদ্ধ করে প্রতিষেধক বানানো হয়।