বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬
ব্রেকিং

হাসিনার পলায়নের ভিডিও প্রকাশকারী হিসেবে আলোচিত সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সৌরির মরদেহ তুরাগে উদ্ধার

নিখোঁজের পরদিন বুধবার বিকেলে উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় তুরাগ নদে ভাসমান অবস্থায় মরদেহ পায় নৌ পুলিশ; প্রাথমিকভাবে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ধারণা, তবে ময়নাতদন্তের আগে কারণ নিশ্চিত করছে না পুলিশ।

কে এম তাহসিফ সৌরি
ছবি: কে এম তাহসিফ সৌরি

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের মুহূর্তের ভিডিও ফেসবুকে প্রথম ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় আলোচনায় আসা বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরির মরদেহ রাজধানীর তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ হওয়ার পরদিন বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় নদে ভাসমান অবস্থায় ২৮ বছর বয়সী এই সাবেক কর্মকর্তার মরদেহ পায় নৌ পুলিশ। পুলিশ বলছে, প্রাথমিকভাবে পানিতে ডুবে মৃত্যু বলে ধারণা করা হলেও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ নিয়ে তারা নিশ্চিত করে কিছু বলছে না। অন্যদিকে তাঁর সহপাঠী, সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, এটি ‘পরিকল্পিত হত্যা’ কি না; তাঁরা নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত দাবি করেছেন।

যেভাবে মিলল মরদেহ

পুলিশ ও পরিবারের ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, তাহসিফ সৌরি (কোনো কোনো সূত্রে তাওসিফ সৌরি বা তাহসিফ সুরি নামেও উল্লেখ করা হচ্ছে) উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের একটি ফ্ল্যাটে পরিবারের সঙ্গে থাকতেন। তাঁর বাবার নাম কে এম এনায়েত হেলাল। গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাতে বাসা থেকে বেরিয়ে তিনি আর ফেরেননি। স্বজনেরা সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ করেও তাঁর সন্ধান পাননি।

পরদিন বুধবার বিকেল আনুমানিক সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে নৌ পুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির একটি দল রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় গিয়ে তুরাগ নদে ভাসমান একটি মরদেহ উদ্ধার করে। টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন বলেন, ‘আমরা তার লাশ ভাসমান অবস্থায় পাই।’ মরদেহের পরনে ছিল সাদা পায়জামা ও কালো শার্ট; পকেটে থাকা একটি আইফোন এবং হাতের ঘড়ি দেখে পুলিশ তাঁর পরিচয় শনাক্ত করে। পরে পরিবারের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ শনাক্ত করেন।

সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, এলাকাটি নদীতীরে থানার শেষ সীমানায় হওয়ায় টঙ্গী নৌ পুলিশই মরদেহ উদ্ধার করেছে এবং নৌ পুলিশের কাছ থেকেই তাঁরা জানতে পারেন, মরদেহটি তাহসিফ সৌরির। থানার ডিউটি অফিসার শাহীনুর জামানও বৃহস্পতিবার সকালে উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করেন।

মৃত্যুর কারণ নিয়ে পুলিশ যা বলছে

নৌ পুলিশের নিয়ন্ত্রণকক্ষে দায়িত্বরত এক সদস্য জানান, প্রাথমিকভাবে পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবে প্রকৃত কারণ ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন থেকেই জানা যাবে। পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিনও বলেন, ‘ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত করে বলা যাবে।’ উত্তরা থেকে তিনি কীভাবে উত্তরখানের নির্জন নদীতীরে পৌঁছালেন, সে প্রশ্নেরও কোনো উত্তর এখনো পুলিশের কাছে নেই। নৌ পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রাথমিকভাবে মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ধারণ করা যায়নি; শরীরে আঘাতের চিহ্ন আছে কি না এবং পারিপার্শ্বিক বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে, আর উত্তরা ও উত্তরখান এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।

এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো কিছু জানায়নি। পরিবারের সদস্যরাও এখন পর্যন্ত গণমাধ্যমে কোনো বক্তব্য দেননি। তবে পরিবারের ঘনিষ্ঠজন ও পরিচিতদের পক্ষ থেকে ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।

‘পলিটিকাল’ না দুর্ঘটনা, প্রশ্ন সহপাঠীদের

মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাহসিফের মৃত্যু আর ৫ আগস্টের ভিডিও, এই দুটি বিষয়কে মিলিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। আদমজী কলেজে তাঁর সহপাঠী এবং মিলিটারি একাডেমিতে কোর্সমেট কে এস এম ইন্তিসার ইনজামাম ফেসবুকে লিখেছেন, মরদেহের হাত কাদামাখা থাকলেও শরীরের বাকি অংশ ছিল তুলনামূলক পরিষ্কার। তাঁর ভাষায়, ‘ব্যক্তিগত বিরোধ বা দুর্ঘটনা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত না হলে আমি ধরে নেবো এটা পলিটিকাল।’ তিনি আরও লিখেছেন, ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর তাহসিফকে নানাভাবে হেয় করা হলেও তাঁর জানামতে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি; ৫ আগস্টের এক সপ্তাহ আগেও তিনি তাহসিফকে স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন করতে দেখেছেন।

সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক তানভীর হাসান জোহা এক পোস্টে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের পাশাপাশি সিসিটিভি ফুটেজ, কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) ও অন্যান্য আলামত দ্রুত সংরক্ষণের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে লিখেছেন, ‘প্রমাণের আগে মৃত্যুর সঙ্গে সেই ঘটনার যোগসূত্র টানা ঠিক হবে না।’ তাঁর মন্তব্য, ‘পরিবার উত্তর পাওয়ার অধিকার রাখে’, আর তদন্তের অগ্রগতি জনসমক্ষে জানানো উচিত।

অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের লিখেছেন, ২০২৪ সালের আগস্টে বিমানবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত চার কর্মকর্তার একজন ছিলেন তাহসিফ। প্রাথমিকভাবে পানিতে ডুবে মৃত্যুর কথা বলা হলেও প্রকৃত কারণ ময়নাতদন্তের পরই জানা যাবে বলে তিনিও মনে করিয়ে দিয়েছেন। অনেকে আবার মন্তব্য করেছেন, প্রমাণ ছাড়া ভিডিওর সঙ্গে এই মৃত্যুকে জড়ানো ঠিক নয়।

৫ আগস্টের সেই ভিডিও

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকার কুর্মিটোলায় বিমানবাহিনীর ঘাঁটি থেকে সামরিক আকাশযানে ভারতে চলে যান। সেদিনই দূর থেকে ধারণ করা কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যাতে হাসিনাকে বহনকারী আকাশযানের উড্ডয়নের মুহূর্ত দেখা যায়। দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে প্রচারিত সেই ফুটেজই হয়ে ওঠে হাসিনার দেশত্যাগের প্রথম দৃশ্যমান প্রমাণ এবং অভ্যুত্থানের অন্যতম স্মরণীয় দৃশ্য।

ভিডিওটি কে ধারণ করেছিলেন, আর কে প্রথম প্রকাশ করেছিলেন, তা নিয়ে শুরু থেকেই আলোচনা ছিল। মরদেহ উদ্ধারের পর অনেকেই তাহসিফকে ভিডিওটির ধারণকারী হিসেবে বর্ণনা করছেন। তবে ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট একটি জাতীয় দৈনিকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বিমানবাহিনীর গোয়েন্দা তদন্তের বরাত দিয়ে দাবি করা হয়, ভিডিওটি কুর্মিটোলা ঘাঁটির অফিসার্স মেসের জানালা থেকে মোবাইলে ধারণ করেছিলেন প্রশাসন শাখার ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রিফাত আশরাফী, আর সেটি নিজের ফেসবুক টাইমলাইন থেকে প্রথম পোস্ট করেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সৌরি। ক্যামেরার কোণ ও অবস্থান বিশ্লেষণ করে ধারণকারীকে শনাক্ত করা হয় বলে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়। প্রতিবেদকের ফোন পেয়ে তাহসিফ প্রথমে ‘কোন ভিডিও?’ বলে এড়িয়ে যান; পরে বলেন, ভিডিওটি পোস্ট করে অনেকে টাকা কামিয়েছে, এরপর ফোনালাপ রেকর্ড হচ্ছে বলে আর কথা বলতে রাজি হননি। এমনটাই লেখা হয় ওই প্রতিবেদনে।

ওই প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, এই ভিডিওর সূত্র ধরেই বিমানবাহিনীর ভেতরে একটি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার নেটওয়ার্ক শনাক্ত হয় এবং রিফাত ও তাহসিফসহ কয়েকজন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) সেদিন রাতেই এক প্রতিবাদলিপিতে প্রতিবেদনটিকে ‘বিভ্রান্তিকর’ আখ্যা দেয়। আইএসপিআর জানায়, বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ‘সম্পূর্ণ অমূলক’; নাম আসা ছয় জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নির্ধারিত বয়সসীমা শেষে স্বাভাবিকভাবে অবসরে গেছেন, আর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রিফাত আশরাফী ও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সুরিকেও ‘ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বিমানবাহিনীর প্রচলিত আইন ও বিধিমালার আওতায় যথাযথ প্রক্রিয়ায় অবসর প্রদান করা হয়েছে’, যার সঙ্গে ওই অভিযোগের কোনো সম্পর্ক নেই। সেই ‘ভিন্ন প্রেক্ষাপট’ কী, তা অবশ্য আইএসপিআর ব্যাখ্যা করেনি।

তাহসিফের পরিচিতজন ও একাধিক সূত্রের ভাষ্য, ২০২৪ সালের আগস্টের শেষ দিকে, অর্থাৎ ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই, আরও কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁকে বিমানবাহিনীর চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। সম্প্রতি তিনি উত্তরায় পরিবারের সঙ্গেই থাকছিলেন।

এখন যা দেখার

পুলিশ বলছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পরই মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হবে। মৃত্যুটি দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা না হত্যাকাণ্ড, এবং ৫ আগস্টের ভিডিওর সঙ্গে এর আদৌ কোনো সম্পর্ক আছে কি না, সে প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে ময়নাতদন্ত, সিসিটিভি ফুটেজ ও মোবাইল ফোনের তথ্য বিশ্লেষণের ওপর। অভ্যুত্থানের একটি প্রতীকী দৃশ্যের সঙ্গে নাম জড়িয়ে থাকা এই তরুণ সাবেক কর্মকর্তার মৃত্যু ঘিরে তাই নজর থাকছে পুলিশের তদন্তের দিকে।