জাহাজভাঙা শিল্পের মালিকদের দীর্ঘদিনের দাবি মেনে এ শিল্পকে পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালায় লাল শ্রেণি থেকে কমলা শ্রেণিতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর ফলে ইয়ার্ড স্থাপনের আগে পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) করার বাধ্যবাধকতা উঠে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। পরিবেশবাদীরা আশঙ্কা করছেন, এতে শ্রমিক ও পরিবেশ—দুটিই ঝুঁকিতে পড়বে।
পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা-২০২৩ অনুযায়ী, জাহাজভাঙা কার্যক্রম ও ইয়ার্ড দুটোই এখন লাল শ্রেণির শিল্প; এ শ্রেণির স্থাপনা পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর তীব্র প্রভাব ফেলে। বিদ্যমান নিয়মে ইয়ার্ড বসাতে হলে প্রথমে ইআইএ করতে হয়, যা ভারত ও পাকিস্তানের জাহাজভাঙা শিল্পের জন্যও বাধ্যতামূলক। পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে সময় লাগে প্রায় ৯০ দিন। উদ্যোক্তারা বলছেন, এতে তাঁরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
জানা যায়, গত ২৯ সেপ্টেম্বর এ-সংক্রান্ত কমিটি শিল্পটিকে লাল থেকে কমলায় আনার সিদ্ধান্ত নেয়। আগস্টে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পসংক্রান্ত বিদ্যমান আইন, বিধি ও নীতিমালা পর্যালোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে কমিটিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটির সভাপতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু; সদস্যদের মধ্যে আছেন শিল্পমন্ত্রী, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, অর্থ বিভাগের সচিব এবং আইন ও সংসদবিষয়ক সচিব। কোনো পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধি বা পরিবেশ বিশেষজ্ঞকে কমিটিতে রাখা হয়নি।
পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, হংকং কনভেনশন অনুযায়ী দেশে ১৫ থেকে ২০টি গ্রিন ইয়ার্ড আছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, তাঁরা একেকটি ইয়ার্ডে ১৫০ কোটি টাকার মতো বিনিয়োগ করেছেন। লাল শ্রেণিতে থাকায় অনুমতি পেতে তিন মাস অপেক্ষা করতে হয়, এতে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পরিবেশদূষণের ঝুঁকি বাড়বে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, পরিবেশ ও শিল্প দুটোই বাঁচাতে হবে।
কমলা শ্রেণিতে গেলে ইয়ার্ড স্থাপনের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয়ে প্রাথমিক পরিবেশগত সমীক্ষা প্রতিবেদন দিতে হবে। ইআইএ প্রয়োজন মনে করলে বিভাগীয় কার্যালয় সুপারিশ করতে পারবে, তবে তা মানা বাধ্যতামূলক থাকবে না। চূড়ান্ত অনুমোদনও দেবে বিভাগীয় কার্যালয়; সদর দপ্তরে যেতে হবে না। পরিবেশ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, এতে একটি ইয়ার্ড কী পরিমাণ দূষণ করবে, তা জানার সুযোগ থাকবে না এবং তদারকি দুর্বল হয়ে পড়বে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান বলেন, এটি খুবই সম্ভাবনাময় একটি শিল্প; ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী সাড়ে ছয় হাজার জাহাজ ভাঙার উপযোগী হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের সূত্র অনুযায়ী, এখন প্রতিবছর চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ইয়ার্ডগুলোতে ১৫০ থেকে ২০০ জাহাজ ভাঙা হয় এবং এসব ইয়ার্ডে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। পরিবেশবাদীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এ শিল্পকে সবচেয়ে বিপজ্জনক হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।