রাজধানীর খিলক্ষেতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার বাড়িতে গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে ২৬ জন নারীসহ অন্তত ৮৫ জনকে গ্রেপ্তার ও সংক্ষিপ্ত বিচারে কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন ১০১ জন নাগরিক। রোববার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তাঁরা আটক ও দণ্ডিত ব্যক্তিদের অবিলম্বে মুক্তি, ঘটনার স্বাধীন তদন্ত এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান।
বিবৃতিতে বলা হয়, গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অভিযানে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শের সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে যে অভিযোগ উঠেছে, তা গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। বিবৃতিদাতারা জানতে চেয়েছেন, কার নির্দেশে, কী উদ্দেশে ও কোন আইনি ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়েছিল এবং গ্রেপ্তার ও দণ্ডাদেশের সিদ্ধান্ত কারা নিয়েছেন।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তার পুরুষদের ৩০ দিন এবং নারীদের ১৫ দিন করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে প্রত্যেকের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ ছিল এবং কী প্রমাণের ভিত্তিতে তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে, তা ওই প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয় বলে উল্লেখ করেন বিবৃতিদাতারা।
‘মোরাল পুলিশিং’ নিয়ে প্রশ্ন
বিবৃতিদাতাদের ভাষ্য, ‘মাদকবিরোধী অভিযানের’ নামে পুলিশ ক্যামেরা নিয়ে ব্যক্তিগত আয়োজনে হাজির হচ্ছে এবং সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিদের ছবি ও পরিচয় গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। তাঁদের মতে, অপরাধ প্রমাণের আগেই কাউকে জনসমক্ষে হেয় করা কার্যত বিচারের আগেই সামাজিক শাস্তি দেওয়ার শামিল।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ব্যক্তিগত পরিসরে আড্ডা দেওয়া, গান শোনা, নাচ করা কিংবা নারী-পুরুষের একসঙ্গে সামাজিক আয়োজনে অংশ নেওয়া বাংলাদেশের আইনে অপরাধ নয়। কারও পোশাক, জীবনযাপন বা বিনোদন নিয়ে ব্যক্তিগত অপছন্দকে রাষ্ট্রীয় শাস্তির ভিত্তি করা যায় না। এ ধরনের চর্চাকে তাঁরা ‘মোরাল পুলিশিং’ বা নৈতিকতার নামে পুলিশি নিয়ন্ত্রণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সংবিধানের ৩১, ৩২, ৩৩, ৩৫ ও ৪৩ অনুচ্ছেদের কথা তুলে ধরে তাঁরা বলেন, আইনের আশ্রয়, ব্যক্তিস্বাধীনতা, গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে সুরক্ষা এবং বিচার ও দণ্ডের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক নিশ্চয়তা মানতে হবে।
চার দফা দাবি
- আটক ও দণ্ডিত ব্যক্তিদের অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া।
- এজাহার, জব্দতালিকা ও দণ্ডাদেশের অনুলিপি অবিলম্বে সরবরাহ করা।
- আইনি ভিত্তি বা প্রয়োজনীয় প্রমাণের অভাব কিংবা আইন লঙ্ঘন প্রতিষ্ঠিত হলে দণ্ডাদেশ বাতিলসহ উপযুক্ত প্রতিকার দেওয়া।
- আটক ব্যক্তিদের ছবি, ভিডিও ও পরিচয়সহ ব্যক্তিগত তথ্য ছড়ানোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযান, গ্রেপ্তার ও সংক্ষিপ্ত বিচারে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা।
বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন লেখক, অধ্যাপক, আইনজীবী, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিসহ মোট ১০১ জন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন ও খুশী কবির, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, আলোকচিত্রী শহিদুল আলম এবং জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন।