বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬

বয়স বাড়লে প্রস্টেট কেন বড় হয়, খোঁজ মিলল নতুন ধরনের কোষের

প্রস্টেটের যে অংশে গ্রন্থি বড় হওয়ার সমস্যা শুরু হয়, সেখানে আগে অজানা এক ধরনের কোষ শনাক্ত করেছেন মার্কিন বিজ্ঞানীরা, যা ভবিষ্যতে নতুন ওষুধের লক্ষ্য হতে পারে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রায় সব পুরুষেরই প্রস্টেট গ্রন্থি ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থার নাম বিনাইন প্রস্টেটিক হাইপারপ্লাসিয়া বা বিপিএইচ। এটি ক্যানসার নয়, তবে বড় হয়ে যাওয়া গ্রন্থি মূত্রনালিতে চাপ দেয়। ফলে রাতে বারবার প্রস্রাবের জন্য উঠতে হয়, প্রস্রাবের ধারা দুর্বল হয়ে যায়। কেন এমন হয়, আর কেন সমস্যাটি গ্রন্থির একটি নির্দিষ্ট অংশেই শুরু হয়, সেই রহস্যের একটি সম্ভাব্য উত্তর দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক।

তাঁরা প্রস্টেটে এমন এক ধরনের কোষের খোঁজ পেয়েছেন, যার কথা আগে জানা ছিল না। কোষগুলো জমা থাকে ঠিক সেই অংশে, যেখান থেকে প্রায় সব ক্ষেত্রে বিপিএইচ শুরু হয়। গবেষণাটি গত ১০ সেপ্টেম্বর বিজ্ঞান সাময়িকী দ্য জার্নাল অব প্যাথলজিতে প্রকাশিত হয়েছে।

কোথা থেকে শুরু হয় সমস্যা

প্রস্টেট গ্রন্থির প্রধান তিনটি অংশ বা জোন আছে: পেরিফেরাল জোন, সেন্ট্রাল জোন ও ট্রানজিশন জোন। প্রতিটি অংশের কোষের গঠন আলাদা, রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতাও আলাদা। মূত্রনালিকে ঘিরে থাকা ট্রানজিশন জোনেই প্রায় একচেটিয়াভাবে বিপিএইচ দেখা দেয়। অন্যদিকে প্রস্টেট ক্যানসারের বেশির ভাগ শুরু হয় পেরিফেরাল জোনে।

গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক জনস হপকিনস কিমেল ক্যানসার সেন্টারের অনকোলজি ও প্যাথলজির অধ্যাপক ভাসান ইয়েগনাসুব্রামানিয়ান বলেন, বিপিএইচ কেন মূলত ট্রানজিশন জোনেই হয়, বিজ্ঞানীরা এখনো তা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননি।

১ লাখ ৩০ হাজার কোষের খুঁটিনাটি

প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গবেষকেরা স্থানীয় পর্যায়ের প্রস্টেট ক্যানসারের অস্ত্রোপচার করা ১০ জন পুরুষের গ্রন্থি থেকে ক্যানসারমুক্ত সুস্থ টিস্যু সংগ্রহ করেন। গ্রন্থির তিনটি অংশ থেকেই নমুনা নেওয়া হয়। এরপর সিঙ্গেল-সেল আরএনএ সিকোয়েন্সিং নামের একটি পদ্ধতিতে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোষ আলাদা আলাদা করে পরীক্ষা করা হয়। এই পদ্ধতিতে প্রতিটি কোষে কোন কোন জিন সক্রিয় আছে, তা পড়া যায়। ফলে একই রকম দেখতে কোষের মধ্যেও সূক্ষ্ম পার্থক্য ধরা পড়ে।

বিশ্লেষণে গবেষকেরা বেসাল কোষের চারটি আলাদা ধরন পান। বেসাল কোষ হলো গ্রন্থির ভেতরের আস্তরণে থাকা এক ধরনের সহায়ক কোষ। চারটি ধরনের একটিতে WIF1 নামের একটি জিন অস্বাভাবিক বেশি সক্রিয়। এই কোষের সঙ্গে যুক্ত আরও কয়েকটি জিনও ট্রানজিশন জোনেই বেশি সক্রিয় দেখা গেছে।

পরে গবেষণাগারে টিস্যু পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া যায়, WIF1-সক্রিয় এই বেসাল কোষগুলো ট্রানজিশন জোনে প্রচুর পরিমাণে থাকে, অথচ পেরিফেরাল ও সেন্ট্রাল জোনে প্রায় নেই বললেই চলে। গবেষণার প্রথম লেখক ও জনস হপকিনসের গবেষণা সহযোগী রুলিন ওয়াং বলেন, বিপিএইচে আক্রান্ত টিস্যুতে WIF1-সক্রিয় বেসাল কোষের সংখ্যা বেড়ে যায় বলেও তাঁরা দেখতে পেয়েছেন। আগে প্রকাশিত অন্য গবেষণার তথ্য নতুন করে বিশ্লেষণ করেও একই চিত্র মিলেছে।

কোষগুলো কী করে

গবেষকদের মতে, এই কোষগুলোর জিনে টিস্যুর গঠন বদলে দেওয়া এবং আশপাশের কোষের সঙ্গে সংকেত আদান-প্রদানের লক্ষণ রয়েছে। এদের কিছু জিন পুরুষ হরমোন টেস্টোস্টেরনের প্রতি সাড়া দেয়। এসব কারণে গবেষক দলের ধারণা, এই কোষগুলো ট্রানজিশন জোনের পরিবেশকে এমনভাবে বদলে দিতে পারে, যাতে সেখানে গ্রন্থির অতিরিক্ত বৃদ্ধি সহজ হয়।

গবেষকেরা আরেকটি সম্ভাবনার কথাও বলছেন। WIF1 জিনটি কোষের বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত ‘উইন্ট’ নামের একটি সংকেতপথকে দমন করার জন্য পরিচিত। ফলে এই কোষগুলো হয়তো আশপাশের বৃদ্ধির সংকেতকে কিছুটা শান্ত রাখে। তাঁদের ধারণা, এটি ব্যাখ্যা করতে পারে কেন ট্রানজিশন জোনে প্রস্টেট ক্যানসার কম শুরু হয়।

চিকিৎসায় কী বদলাতে পারে

বর্তমানে বিপিএইচের চিকিৎসা মূলত দুই ধরনের ওষুধনির্ভর। একটি হলো আলফা ব্লকার, যা প্রস্টেট ও মূত্রথলির মুখের পেশি শিথিল করে প্রস্রাব সহজ করে। অন্যটি ৫-আলফা রিডাক্টেজ ইনহিবিটর, যা গ্রন্থিকে ছোট করে বা এর বৃদ্ধি ধীর করে। ওষুধে কাজ না হলে বা উপসর্গ গুরুতর হলে অস্ত্রোপচার কিংবা জলীয় বাষ্প থেরাপির মতো কম কাটাছেঁড়ার পদ্ধতি বেছে নেওয়া হয়। তবে অস্ত্রোপচারেও রোগ পুরোপুরি সারে না।

গবেষকদের আশা, রোগের পেছনে নির্দিষ্ট একটি কোষকে চিহ্নিত করা গেলে সেটিকে লক্ষ্য করে নতুন ওষুধ তৈরির পথ খুলতে পারে। এতে ভবিষ্যতে বিপিএইচ প্রতিরোধ, শনাক্ত ও চিকিৎসা আরও নিখুঁতভাবে করা সম্ভব হতে পারে।

এখনো প্রমাণের অপেক্ষা

তবে গবেষকেরা নিজেরাই সতর্ক করছেন, এই ফলাফল এখন পর্যন্ত মানুষের টিস্যুতে পাওয়া একটি সম্পর্ক মাত্র। কোষগুলোই যে গ্রন্থি বড় হওয়ার কারণ, তা এখনো প্রমাণিত হয়নি। গবেষণায় মাত্র ১০ জনের টিস্যু ব্যবহার করা হয়েছে, আর তাঁরা সবাই ছিলেন প্রস্টেট ক্যানসারের রোগী। কোষগুলো সত্যিই বিপিএইচ ঘটায় কি না, তা প্রমাণ করাই এখন পরবর্তী ধাপ।

কতটা সাধারণ বিপিএইচ

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের (এনআইএইচ) তথ্য অনুযায়ী, ৪০ থেকে ৬৪ বছর বয়সী পুরুষদের ৫ থেকে ৬ শতাংশ এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের ২৯ থেকে ৩৩ শতাংশ বিপিএইচে ভোগেন। ৪০ বছরের কম বয়সে এর উপসর্গ খুব কমই দেখা যায়। প্রস্রাব শুরু করতে কষ্ট, দুর্বল বা থেমে থেমে প্রস্রাব, ঘন ঘন ও রাতে বারবার প্রস্রাবের বেগ এর সাধারণ লক্ষণ।

চিকিৎসকেরা বলছেন, প্রস্রাব একেবারে বন্ধ হয়ে গেলে, প্রস্রাবে রক্ত গেলে বা তলপেটে তীব্র ব্যথা হলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত। প্রস্টেট ক্যানসারেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে, তাই প্রস্রাবজনিত যেকোনো সমস্যা চিকিৎসককে দেখানো জরুরি।