রবিবার, ০৮ নভেম্বর, ২০২৬

রামেক হাসপাতালে নকল এক্স-রে ফিল্ম ও নিম্নমানের টিউব সরবরাহের অভিযোগ, ৭২ লাখ টাকার বিল জমা

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ফুজি ফিল্মের মোড়কে নকল এক্স-রে ফিল্ম এবং নির্ধারিত ব্র্যান্ডের বদলে চীনের টিউব সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে রোগ নির্ণয়ের জন্য দরকারি উপকরণ সরবরাহে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ফুজি ফিল্মের মোড়কে নকল এক্স-রে ফিল্ম এবং নির্ধারিত ব্র্যান্ডের বদলে নিম্নমানের ভ্যাকুটেইনার টিউব সরবরাহ করেছে। হাসপাতাল সূত্রের দাবি, এসব উপকরণ ইতিমধ্যে ব্যবহার হচ্ছে এবং বিল পরিশোধের প্রক্রিয়াও চলছে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, এক্স-রে ফিল্ম সরবরাহের কার্যাদেশ পেয়েছিলেন রাজশাহীর ঠিকাদার মতিউর রহমান। গত ২৬ সেপ্টেম্বর তাঁকে ১০ বাই ১৪ ইঞ্চি আকারের ২০০ প্যাকেট এবং ১৪ বাই ১৭ ইঞ্চি আকারের ৮৫ প্যাকেট ফিল্ম সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া হয়। ১০ অক্টোবর তিনি এসব ফিল্ম হাসপাতালে জমা দেন। ছোট প্যাকেটের দাম ধরা হয় ২৫ হাজার ৬২৫ টাকা, বড় প্যাকেটের দাম ২৫ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে ৭২ লাখ ৫০ হাজার টাকার বিল জমা দেওয়া হয়েছে।

প্যাকেটের গায়ে ফুজি ফিল্মের লোগো থাকলেও বাংলাদেশে ওই ব্র্যান্ডের একমাত্র পরিবেশক মেডি গ্রাফিক ট্রেডিং লিমিটেড বলছে, এসব ফিল্ম তাদের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির ডেপুটি ম্যানেজার (সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং) রিফাত হাসান বলেন, দেশে এই ব্র্যান্ডের ফিল্ম যেখানেই যাক, তা তাঁদের মাধ্যমে যাওয়ার কথা। তাঁর দাবি, বিভিন্ন দেশে ফুজির মোড়ক ব্যবহার করে নকল ফিল্ম তৈরি হয়, যা আসল পণ্যের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ কম দামে বিক্রি হয়। রামেকে সরবরাহ করা ফিল্মও এমন হতে পারে বলে তাঁদের ধারণা। তিনি বলেন, নিম্নমানের ফিল্মে তোলা ছবির মান খারাপ হয় এবং অল্প সময়ে ছবি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঠিকাদার মতিউর রহমান। তিনি বলেন, ফিল্ম কখনো নকল হয় না; সন্দেহ থাকলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নমুনা ঢাকায় পাঠিয়ে পরীক্ষা করাতে পারে। অনুমোদিত পরিবেশকের কাছ থেকে কেন ফিল্ম কেনা হয়নি, জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি এখন মানিকগঞ্জে আছেন; সামনাসামনি দেখা হলে ব্যাখ্যা দেবেন।

রক্তের নমুনা সংগ্রহের টিউব সরবরাহেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। গেটওয়ে ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি প্রতিষ্ঠান ২৬ সেপ্টেম্বর আড়াই লাখ টিউব সরবরাহের কার্যাদেশ পায় এবং ১০ অক্টোবর তা জমা দেয়। কার্যাদেশে জেএমআই বা এএনসি ব্র্যান্ডের টিউব দেওয়ার কথা থাকলেও এর মধ্যে ১ লাখ ৪০ হাজার পিস এসেছে চীনের জিআর ব্র্যান্ডের। এগুলোর মধ্যে সিরাম পরীক্ষার জন্য ৭০ হাজার লাল এবং পূর্ণ রক্ত গণনার (সিবিসি) জন্য ৭০ হাজার বেগুনি রঙের টিউব রয়েছে। হাসপাতাল সূত্রের দাবি, জিআর ব্র্যান্ডের টিউবের দাম জেএমআই বা এএনসির তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম। প্রতিষ্ঠানটি এর মধ্যে ২০ লাখ টাকার বিল জমা দিয়েছে।

প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী সোহেল রানা বলেন, জেএমআই ব্র্যান্ডের টিউব দেওয়ার কথা থাকলেও তখন কোম্পানির কাছে পর্যাপ্ত পণ্য ছিল না, আবার হাসপাতালেরও জরুরি ভিত্তিতে টিউব দরকার ছিল। তাই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই প্রথম দফায় জিআর ব্র্যান্ডের টিউব দেওয়া হয়; পরে জেএমআইয়ের টিউবও সরবরাহ করা হয়েছে।

হাসপাতাল সূত্রের অভিযোগ, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমেই এই সরবরাহের সুযোগ মিলেছে। সূত্রের দাবি, মতিউর রহমানের প্রতিষ্ঠান পরিবেশকের অনুমোদনপত্র ছাড়াই কার্যাদেশ পেয়েছে। জরুরি প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে প্যাথলজি বিভাগের প্রধানও জিআর ব্র্যান্ডের টিউব নিতে সম্মতি দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। অভিযোগের বিষয়ে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি ও হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. হাসানুল হাসিব বলেন, টেন্ডারের মাধ্যমে মালামাল কেনা হয় এবং কাগজপত্র ঠিক থাকলে তা গ্রহণ করা হয়। এর বেশি জানতে হলে হাসপাতালের মুখপাত্র বা পরিচালকের সঙ্গে কথা বলতে হবে বলে তিনি জানান।