বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর, ২০২৬

স্বৈরাচারের নির্মমতার মুখে চিরভাস্বর এক আলোকবর্তিকা

অসীমের মাঝে তোমার অমর উপস্থিতি—যেন মহাকালের অন্তে খুঁজে পাওয়া এক হারানো নক্ষত্র

আবরার ফাহাদ
ছবি: আবরার ফাহাদ

আজ ৭ই অক্টোবর, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, দেশপ্রেম এবং বৈষম্য ও প্রভূত্ববাদের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর প্রদীপ্ত প্রতীক শহীদ আবরার ফাহাদের শাহাদাত বার্ষিকী। ২০১৯ সালের এই দিনে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শেরেবাংলা হলে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারান তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল (EEE) বিভাগের এই মেধাবী শিক্ষার্থী।

আবরার ফাহাদের এই নির্মম ট্র্যাজেডি কেবল একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নয়; বরং তা বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির কলঙ্কিত অধ্যায় প্রকাশ এবং আধিপত্যবাদ বিরোধী জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটানোর অন্যতম বাঁক হিসেবে বিবেচিত।

কেন হত্যাকাণ্ডের শিকার হন আবরার ফাহাদ?

২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে তৎকালীন সরকার ভারতের সাথে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন পেন্ডিং রেখে ফেনী নদী থেকে ভারতকে পানি দেওয়ার সিদ্ধান্তসহ বঙ্গোপসাগরে যৌথ নজরদারি এবং চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষর করে।

একজন সচেতন নাগরিক ও দেশপ্রেমিক শিক্ষার্থী হিসেবে আবরার ফাহাদ ৫ই অক্টোবর তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব চুক্তির জাতীয় ও কৌশলগত ক্ষতির দিক তুলে ধরে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যুক্ত করে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যকার অসম চুক্তির যৌক্তিক ও স্পষ্ট সমালোচনা করেন।

দেশীয় স্বার্থ রক্ষা ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বাধীন সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে তাঁর এই স্পষ্ট মতামত সহ্য করতে পারেনি তৎকালীন ক্ষমতাশীল দলের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ক্যাডাররা।

৬ই অক্টোবর মধ্যরাতের কালরাত ও বর্বর নির্যাতন

২০১৯ সালের ৬ই অক্টোবর রাত আটটার দিকে শেরেবাংলা হলের ১০১১ নম্বর রুম থেকে আবরার ফাহাদকে ডেকে নেওয়া হয় ২০১১ নম্বর কক্ষে। সেখানে তৎকালীন ছাত্রলীগের ক্যাডাররা তাঁকে শিবিরের সাথে জড়িত থাকার মনগড়া অভিযোগ এনে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে।

পরবর্তী চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা ধরে ক্রিকেটের স্টাম্প, মোটা রসি ও বেল্ট দিয়ে তাঁর ওপর চলে অমানবিক নির্যাতন। দফায় দফায় শারীরিক নির্যাতনের ফলে আবরারের সমস্ত শরীরে চরম রক্তক্ষরণ হয়। রাত তিনটার দিকে শেরেবাংলা হলের সিঁড়ি থেকে তাঁর নিথর দেহ উদ্ধার করেন চিকিৎসকরা, এবং তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে উঠে আসে, অতিরিক্ত আঘাতের কারণে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল।

বিচার প্রক্রিয়া ও ন্যায়বিচারের রায়

আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও গণদাবি গড়ে তোলে। বুয়েটসহ দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজপথে হাজার হাজার সাধারণ শিক্ষার্থী বিচার ও বুয়েট ক্যাম্পাসে রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে আন্দোলনে নামেন।

তীব্র জনদাবির মুখে পুলিশ দ্রুত তদন্ত শেষ করে হত্যা মামলায় ২৫ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়। ২০২১ সালের ৮ই ডিসেম্বর ঢাকার একটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন।

আবরারের রক্তের উত্তরাধিকার: জুলাই গণ-অভ্যুত্থান

আবরার ফাহাদ কেবল একজন ব্যক্তি ছিলেন না, তিনি হয়ে ওঠেন এক অবিনাশী আদর্শ। তিনি দেশের তরুণ সমাজকে এক স্পষ্ট বার্তা দিয়ে যান—জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের বিষয়ে কোনো আপস করা যাবে না।

আবরারকে হত্যার পর তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে জমে থাকা ক্ষোভ ও প্রতিবাদ পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন ছাত্র ও সামাজিক আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। তাঁর রেখে যাওয়া আধিপত্যবাদ বিরোধী অবস্থান ও বাংলাদেশপন্থী চেতনার ধারাবাহিকতাই পরবর্তীতে রূপ নেয় ২০২৪ সালের রক্তাক্ত 'জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে'।

আবরার ফাহাদের আত্মত্যাগ তরুণদের শিখিয়েছে কীভাবে কোনো ভয়-ভীতি ছাড়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়। আজ ৭ই অক্টোবরে সমগ্র দেশ ও ছাত্র-জনতা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে এই স্বাধীনচেতা ও দেশপ্রেমিক শহীদকে।