শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬
নোবেল পুরস্কার ২০২৬

রবেন দ্বীপের বন্দিদের আইনি লড়াই থেকে অসলোর মঞ্চ: নোবেল জয়ে ভাসলেন নাভি পিল্লাই

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছে দেওয়া এক মহীয়সী নারী।

নাভি পিল্লাইয়ের ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি জয়ে
ছবি: নাভি পিল্লাইয়ের ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি জয়ে

২০২৬ সালের ৯ই অক্টোবর, নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানিত 'নোবেল শান্তি পুরস্কার'-এর বিজয়ীর নাম ঘোষণা করেছে। এ বছর এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবী, বিচারক এবং জাতিসংঘের প্রাক্তন মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার নাভানেথেম "নাভি" পিল্লাই (Navanethem "Navi" Pillay)।

নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির চেয়ারপ্লাক অসলোতে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, "বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক লড়াই, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং বিশ্বব্যাপী নিপীড়িত ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মানবাধিকার রক্ষায় তাঁর আজীবন নিরলস প্রচেষ্টার জন্য" তাঁকে এই সম্মাননায় ভূষিত করা হলো। পুরস্কার হিসেবে তিনি একটি নোবেল মেডেল, সার্টিফিকেট এবং ১২ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা (প্রায় ১২ লক্ষ মার্কিন ডলার) লাভ করবেন।

বর্ণবাদ থেকে বিশ্বমঞ্চে: এক সংগ্রামী জীবনপট

১৯৪১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে তামিল ভারতীয় বংশোদ্ভূত এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নাভি পিল্লাই। বর্ণবাদী (Apartheid) দক্ষিণ আফ্রিকায় বড় হওয়ার কারণে শৈশব থেকেই তিনি তীব্র বৈষম্যের শিকার হন। তবে সেই প্রতিকূলতাকে জয় করে তিনি নাটাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন পাস করেন এবং পরবর্তীকালে হার্ভার্ড ল স্কুল থেকে ডক্টরেট (S.J.D.) ডিগ্রি অর্জনকারী প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী হওয়ার গৌরব লাভ করেন।

বর্ণবাদ বিরোধী লড়াই: ১৯৬৭ সালে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার নাটাল প্রদেশে প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী হিসেবে নিজস্ব ল ফার্ম খোলেন। সে সময় তিনি নেলসন ম্যান্ডেলাসহ রবেন দ্বীপে বন্দি বহু বর্ণবাদ বিরোধী রাজনৈতিক বন্দিদের আইনি লড়াই পরিচালনা করেন।

প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী বিচারক: ১৯৯৫ সালে বর্ণবাদের অবসান ঘটলে রাষ্ট্রপতি নেলসন ম্যান্ডেলা তাঁকে দক্ষিণ আফ্রিকার হাই কোর্টের প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী বিচারক হিসেবে নিযুক্ত করেন।

আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারে যুগান্তকারী অবদান

আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো ও শান্তিরক্ষায় নাভি পিল্লাইয়ের ভূমিকা অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী:

১. রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনাল (ICTR) ও ধর্ষণের নতুন আইনি সংজ্ঞা

১৯৯৫ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ট্রাইব্যুনাল ফর রুয়ান্ডা (ICTR)-এর বিচারক এবং পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৮ সালে 'জ্যাঁ-পল আকায়াসু'র ঐতিহাসিক মামলায় তিনি প্রমান করেন যে যুদ্ধকালে পদ্ধতিগত ধর্ষণ (Systematic Rape) কেবল যৌন অপরাধ নয়, বরং তা গণহত্যার (Genocide) শামিল। আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে এটি ছিল এক বৈপ্লবিক মোড়।

২. আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC)

২০০৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (International Criminal Court) প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি এর শুরুর দিকের অন্যতম প্রধান বিচারক নির্বাচিত হন এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করার স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলেন।

৩. জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার (২০০৮-২০১৪)

জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান (UN High Commissioner for Human Rights) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি সিরিয়া, সুদান, মিয়ানমার এবং ইয়েমেনের মতো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠস্বর ছিলেন। তিনি বিশ্বজুড়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নারী অধিকার এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় কোনো আপস করেননি।

কেন এই পুরস্কার অর্জন ও এর বৈশ্বিক গুরুত্ব?

বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে সামরিক সংঘাত, মানবাধিকার বিপর্যয় এবং আন্তর্জাতিক আইনের অকার্যকারিতার এক সংকটাপন্ন মুহূর্তে নাভি পিল্লাইয়ের এই নোবেল জয় বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

প্রভাব ও গুরুত্বের ক্ষেত্রবিস্তারিত ব্যাখ্যা
আন্তর্জাতিক আইনের প্রাধান্যতিনি দেখিয়েছেন যে আন্তর্জাতিক আইন কেবল কাগজের দলিল নয়, বরং স্বৈরশাসক ও যুদ্ধাপরাধীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
নারী ও শিশুদের সুরক্ষাযুদ্ধক্ষেত্রে নারীকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার রোধে তাঁর গৃহীত আইনি সিদ্ধান্তসমূহ বিশ্বজুড়ে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখছে।
দক্ষিণ আফ্রিকায় দ্বিতীয় জয়অ্যালবার্ট লুথুলি, ডেসমন্ড টু টু, নেলসন ম্যান্ডেলা ও এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্কের পর দক্ষিণ আফ্রিকার আরেকজন মহান মানবাধিকার যোদ্ধা হিসেবে শান্তির নোবেল পেলেন তিনি।

এক নজরে ২০২৬ নোবেল শান্তি পুরস্কার

বিষয়তথ্য
বিজয়ীনাভানেথেম "নাভি" পিল্লাই (Navi Pillay)
জাতীয়তাদক্ষিণ আফ্রিকান
বয়স৮৫ বছর (জন্ম: ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৪১)
প্রধান দায়িত্বসমূহজাতিসংঘের প্রাক্তন মানবাধিকার হাইকমিশনার, আইসিসি ও রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনালের প্রাক্তন বিচারক
পুরস্কারের মূল্যমান১২ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা
মূল অবদানআন্তর্জাতিক অপরাধ আইন প্রতিষ্ঠা, বর্ণবাদ বিরোধী লড়াই এবং মানবাধিকার রক্ষা

আগামী ১০ই ডিসেম্বর নরওয়ের রাজধানী অসলোর সিটি হলে জাকজমকপূর্ণ আয়োজনের মাধ্যমে নাভি পিল্লাইয়ের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।