বুধবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২৬
নোবেল পুরস্কার ২০২৬

ভূতুড়ে কণার রহস্যভেদ: ২০২৬ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল জয়ী ফ্রান্সিস হালজেন

সুগভীর বরফ ও অপটিক্যাল সেন্সরের সাহায্যে মহাজাগতিক রশ্মির নিখুঁত উৎস সনাক্তকরণ।সুগভীর বরফ ও অপটিক্যাল সেন্সরের সাহায্যে মহাজাগতিক রশ্মির নিখুঁত উৎস সনাক্তকরণ।

ফ্রান্সিস হালজেন, বেলজিয়ান-আমেরিকান কণা-পদার্থবিজ্ঞানী
ছবি: ফ্রান্সিস হালজেন, বেলজিয়ান-আমেরিকান কণা-পদার্থবিজ্ঞানী

২০২৬ সালের ৬ই অক্টোবর, রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অফ সায়েন্সেস আনুষ্ঠানিকভাবে পদার্থবিজ্ঞানে এ বছরের নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে বেলজিয়ান-আমেরিকান কণা-পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হালজেন (Francis Halzen)-এর নাম ঘোষণা করেছে। অ্যান্টার্কটিকার সুগভীর বরফখণ্ডে বিশ্বখ্যাত 'আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি' (IceCube Neutrino Observatory) প্রতিষ্ঠার মূল নকশা, বৈজ্ঞানিক নেতৃত্ব এবং মহাজাগতিক উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো কণা সনাক্তকরণের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে এই সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করা হলো।

ফ্রান্সিস হালজেন বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ উইসকনসিন-ম্যাডিসন (University of Wisconsin–Madison)-এ পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং আইসকিউব প্রজেক্টের প্রধান গবেষক হিসেবে কর্মরত আছেন। পুরষ্কার হিসেবে তিনি পাচ্ছেন ১২ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা (প্রায় ১২ লক্ষ মার্কিন ডলার)।

কেন এই নোবেল জয়: গবেষণার বিস্তারিত পটভূমি

রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অফ সায়েন্সেসের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে— "আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরিতে চূড়ান্ত অবদান এবং মহাজাগতিক উৎস থেকে আসা উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো আবিষ্কারের জন্য" ফ্রান্সিস হালজেনকে এই পুরষ্কার দেওয়া হয়েছে।

১. নিউট্রিনো কি এবং কেন একে 'ভূতুড়ে কণা' বলা হয়?

নিউট্রিনো হলো উপপারমাণবিক কণা বা সাব-অ্যাটমিক পার্টিকেল। এরা মহাবিশ্বের অন্যতম প্রাচুর্যময় কণা হলেও এদের ধরা বা পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত কঠিন:

এদের ভর প্রায় শূন্যের কাছাকাছি।

কোনো বৈদ্যুতিক চার্জ নেই (নিউট্রাল)।

এরা প্রায় কোনো বস্তুর সাথেই বিক্রিয়া (interaction) করে না।

প্রতি সেকেন্ডে কোটি কোটি নিউট্রিনো আমাদের শরীর, ঘরবাড়ি এবং গোটা পৃথিবী ভেদ করে চলে যাচ্ছে, অথচ আমরা কিছুই টের পাই না। এ কারণেই বিজ্ঞানীদের কাছে এরা "ভূতুড়ে কণা" (Ghost Particles) নামে পরিচিত।

২. ফ্রান্সিস হালজেন-এর বৈপ্লবিক চিন্তা (১৯৮৮)

সুদূর গ্যালাক্সি, কৃষ্ণগহ্বর (Black Hole), কিংবা সুপারনোভা বিস্ফোরণ থেকে যেসব নিউট্রিনো পৃথিবীতে আসে, সাধারণ কোনো টেলিস্কোপ দিয়ে তাদের সনাক্ত করা অসম্ভব। ১৯৮০-এর দশকের শেষের দিকে ফ্রান্সিস হালজেন এক অদ্ভুত ও সাহসী বৈজ্ঞানিক প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। তিনি উপলব্ধি করেন, এই ক্ষণস্থায়ী কণাগুলোকে ধরতে হলে পৃথিবীর সবচেয়ে খাঁটি এবং স্বচ্ছ মাধ্যম প্রয়োজন, যা পাওয়া সম্ভব কেবল দক্ষিণ মেরুর সুগভীর জমাট বরফে।

১৯৮৭ সালে তিনি প্রথমে AMANDA (Antarctic Muon And Neutrino Detector Array) নামক একটি ছোট প্রজেক্টের সূচনা করে প্রমাণ করেন যে উত্তপ্ত পানি দিয়ে বরফ গলিয়ে বহু গভীরে সেন্সর বসানো সম্ভব। পরবর্তীতে এই কনসেপ্টের ওপর ভিত্তি করেই জন্ম নেয় বিশালকার ‘আইসকিউব’।

আইসকিউব টেলিস্কোপ: বরফের নিচে এক আশ্চর্য বিজ্ঞান প্রকল্প

দক্ষিণ মেরুর 'আমন্ডসেন-স্কট সাউথ পোল স্টেশনে' বরফের প্রায় দেড় থেকে আড়াই কিলোমিটার নিচে নির্মিত হয়েছে এই আইসকিউব টেলিস্কোপ। এটি মানবইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ ও জটিল বৈজ্ঞানিক অবকাঠামো।

 

সনাক্তকরণ কৌশল (Detection Physics)

১. অত্যন্ত উচ্চ-শক্তির কোনো নিউট্রিনো যখন বরফের অ্যাটমিক নিউক্লিয়াসের সাথে ধাক্কা খায়, তখন 'মিউঅন' (Muon) নামক চার্জযুক্ত কণা তৈরি হয়।

২. এই মিউঅন কণাটি বরফের ভেতর দিয়ে আলোর গতির চেয়েও দ্রুত গতিতে (বরফের মাধ্যমে আলোর গতি কমে যায়) ধাবিত হয়।

৩. এর ফলে বরফের নিচে একধরনের নীলচে আলোর ঝিলিক তৈরি হয়, যাকে চেরেনকভ বিকিরণ (Cherenkov Radiation) বলা হয়।

৪. বরফে নিমজ্জিত ৫,১৬০টি সেন্সর এই নীল আলোর দিক ও সময় পরিমাপ করে নিউট্রিনোটির নিখুঁত মহাজাগতিক উৎস নির্ধারণ করে।

কেন এই অবদানের গুরুত্ব বিজ্ঞান বিশ্বে অপরিসীম?

ফ্রান্সিস হালজেন-এর এই উদ্ভাবন আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের মোড় চিরতরে ঘুরিয়ে দিয়েছে।

১. 'কসমিক রে' (Cosmic Rays) রহস্যের সমাধান

গত এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বিজ্ঞানীদের কাছে রহস্য ছিল— মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী 'কসমিক রে' বা মহাজাগতিক রশ্মি ঠিক কোথায় উৎপন্ন হয়? কসমিক রে চার্জযুক্ত হওয়ায় মহাজাগতিক চৌম্বকক্ষেত্রের প্রভাবে পথ হারিয়ে ফেলে, তাই এদের উৎস চেনা যেত না। কিন্তু নিউট্রিনো সোজাপথে ভ্রমণ করে। ফ্রান্সিস হালজেন-এর আইসকিউব প্রথম প্রমাণ করে যে দূরবর্তী ব্লেজার (Blazar - এক ধরণের অতিভরের ব্ল্যাকহোল কেন্দ্রিক সক্রিয় গ্যালাক্সি) থেকেই এসব কসমিক রে উৎপন্ন হয়।

২. মাল্টি-মেসেঞ্জার অ্যাস্ট্রোনোমি (Multi-Messenger Astronomy)

এতকাল জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা কেবল আলো, এক্স-রে বা রেডিও তরঙ্গের ওপর ভিত্তি করে মহাবিশ্বকে দেখতেন। কিন্তু ধূলিকণা বা গ্যাস ক্ষেত্র আলো আটকে দেয়। নিউট্রিনো যেকোনো বস্তু ভেদ করে সরাসরি চলে আসতে পারে। ফ্রান্সিস হালজেন-এর আবিষ্কার আমাদের মহাবিশ্বকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য এক নতুন ‘চোখ’ তৈরি করে দিয়েছে, যাকে বলা হচ্ছে মাল্টি-মেসেঞ্জার অ্যাস্ট্রোনোমি।

এক নজরে ২০২৬ পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার

বিষয়তথ্য
বিজয়ী বিজ্ঞানীফ্রান্সিস হালজেন (Francis Halzen)
জন্ম ও জাতীয়তা১৯৪৪ সালে বেলজিয়ামে জন্ম; বেলজিয়ান-আমেরিকান
কর্মস্থলপ্রফেসর, ইউনিভার্সিটি অফ উইসকনসিন-ম্যাডিসন, যুক্তরাষ্ট্র
পুরস্কারের কারণআইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরিতে মূল অবদান ও মহাজাগতিক উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো আবিষ্কার
পুরস্কারের মূল্যমান১২ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা (প্রায় ১২ লক্ষ মার্কিন ডলার)
মূল বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রকণা-পদার্থবিজ্ঞান ও নিউট্রিনো অ্যাস্ট্রোনোমি

ফ্রান্সিস হালজেন-এর দীর্ঘ চার দশকের বৈজ্ঞানিক একাগ্রতা, প্রতিকূল পরিবেশকে জয় করার মানসিকতা এবং অ্যান্টার্কটিকার বরফতলকে মহাকাশ পর্যবেক্ষণের টেলিস্কোপে রূপান্তর করার কালজয়ী দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক কণা-পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।